বিজ্ঞাপন:
সংবাদ শিরোনাম:
অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি রাজনৈতিক উত্তাপ, শুরুতেই বড় চাপে সরকার

অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি রাজনৈতিক উত্তাপ, শুরুতেই বড় চাপে সরকার

অনলাইন ডেস্ক: ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়েই বিএনপি সরকারের যাত্রা শুরু। রাজস্ব আদায় কম, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নেই; সেই সঙ্গে ব্যাংক ও শেয়ারবাজার বিকলাঙ্গ। এ অবস্থায় দায়িত্ব গ্রহণের কয়েকদিনের মধ্যেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের মতো বড় একটি বৈশ্বিক সংকট। এর প্রভাবে বেড়েছে জ্বালানি তেলসহ সব ধরনের আমদানি ব্যয়। চাপে পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভরসা ছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার ঋণ। কিন্তু শর্ত পূরণ না হওয়ায় ঋণ দেবে না আইএমএফ। ফলে আইএমএফের শর্ত পূরণে বাড়ানো হয় জ্বালানি তেলের দাম। এতে কৃষি ও শিল্প খাতে বিরূপ প্রভাবের পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধাক্কা লেগেছে। সব মিলিয়ে গভীর সংকটে দেশের অর্থনীতি। খবর দৈনিক যুগান্তর।

অন্যদিকে দেশের রাজনীতিতেও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ রয়েছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়া এবং রাষ্ট্র সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল ইস্যুতে জাতীয় সংসদ উত্তপ্ত। সেই সঙ্গে রাজপথে আন্দোলনে নেমেছে বিরোধী দল। এছাড়াও সংসদে আইন পাশ করে আওয়ামী লীগকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজপথে সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরদারে পলাতক আওয়ামী লীগের সমর্থন থাকতে পারে। সবকিছু মিলে ক্ষমতা গ্রহণের ২ মাসের মাথায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পড়েছে সরকার। পুরো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প অর্থনৈতিক সক্ষমতা আপাতত দৃশ্যমান নেই। সাধারণত একটি নতুন সরকার প্রথম ৩ মাসে সবকিছু গুছিয়ে নেয়।

জানতে চাইলে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বুধবার বলেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে-বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, দেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টানাপোড়েন। তিনি বলেন, জ্বালানি আমদানির উচ্চ ব্যয় মেটাতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। সরকারকে একদিকে আগের ঋণের বোঝা বহন করতে হচ্ছে, অপরদিকে নতুন করে আরও ঋণ নিয়ে অর্থনীতি সচল রাখতে হচ্ছে। এটি বেশ কঠিন কাজ। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আয় না হওয়ায় সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তীব্র চাপ তৈরি হচ্ছে। এছাড়া, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি যে উচ্চপর্যায়ে রয়েছে, আগামীতে তা আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। মূল্যস্ফীতি আরও বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব ফেলবে। তার মতে, এই সংকট উত্তরণে আগামী বাজেটে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে ‘বাস্তবসম্মত ও সংস্কারমুখী’ উদ্যোগ নিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে রাজনীতিতে যা চলছে, সেটি সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ। তবে এখনো এই চ্যালেঞ্জকে সংকট বলা যাবে না। তিনি বলেন, বিরোধী দল সংসদে কথা বলছে, পাশাপাশি জনগণের সমর্থন পাওয়ার জন্য রাজপথে নেমেছে। এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ। তবে সংকট তখন বলা যাবে, যখন বিরোধী দলের এই কর্মসূচি সহিংসতায় রূপ নেবে এবং এর সঙ্গে তৃতীয় কোনো পক্ষ যুক্ত হয়ে সুবিধা নিতে চাইবে। তার মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হলো-হঠাৎ করে সহিংসতা শুরু হয়। এরপর তৃতীয়পক্ষ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে। সরকারকে এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। কারণ অনেক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে একটি নির্বাচন হয়েছে। ফলে দেশের জন্য একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি করা জনগণের প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে জনগণ হতাশ হবে। জনগণের এই হতাশা দেশের রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর।

বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি দেশের অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা কতটা সুসংহত, তা তিনটি সূচক দিয়ে বোঝা যায়। এগুলো হলো-মূল্যস্ফীতির হার, মুদ্রার বিনিময় হার এবং ব্যাংক ঋণের সুদের হারের মধ্যে একটি সমন্বয় থাকবে। তিনটি সূচকই বর্তমানে অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার নির্দেশ করে। চলতি বছরের বাজেটে সরকারের মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে সর্বশেষ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। কিন্তু তেলের দাম বাড়ানোর ফলে চলতি মাসে এটি আরও বাড়বে।

অন্যদিকে টানা কয়েক মাস ডলারের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু এটি আবার বাড়তে শুরু করেছে। বর্তমানে সরকারি এলসি রেটেই এক মার্কিন ডলারের দাম ১২৩ টাকা। খোলা বাজারে সেটি প্রায় ১২৭ টাকা। এছাড়া বর্তমানে শিল্প খাতে ঋণের সুদের হার ১৩-১৪ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এরপরও ঋণ মিলছে না। বিনিয়োগের ওপর এটি মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। অর্থাৎ তিনটি বিনিময় হারের কোনোটিতেই স্বস্তি নেই।

অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক এই সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। আগের সরকারের কাছ থেকে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং সরকারের নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই সমস্যা তৈরি হয়েছে।

২৭ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ ইরানে মার্কিন হামলার আগে বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ছিল ৬৫ ডলার। বর্তমানে তা ১০০ ডলারে উঠেছে। আর বাড়তি দাম সমন্বয় করতে শনিবার দেশে জ্বালানি তেলের দাম ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এতে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, পরিবহণে বাড়তি ভাড়া, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি; পাশাপাশি কৃষি ও অন্যান্য শিল্প এবং সেবাসহ অর্থনীতির সব খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ফলে একদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, অপরদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমছে। এক কথায় সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি নানামুখী চাপে পড়েছে। মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধাক্কা এসেছে।

বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ করে মোট ১০ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সরকারের মোট রাজস্ব আদায় হয় মাত্র জিডিপির ৭ শতাংশের কাছাকাছি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায়ে ঘাটতি ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। এ সময়ে কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, অর্থবছর শেষে ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। কমছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। একটি দেশের বিনিয়োগের চিত্র তিনটি সূচক থেকে পাওয়া যায়। প্রথমত, বিনিয়োগের জন্য নিবন্ধন বাড়বে। বেসরকারি খাতের ঋণ বাড়বে। একই ভাবে মূলধনি যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাড়বে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ। বতর্মানে তা কমে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমেছে। অন্যদিকে মূলধনি যন্ত্র এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানি দুটিই কমেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ১১১ কোটি ডলার। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ১২৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ১৬ কোটি ডলার। একই সময়ে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এলসি নিষ্পত্তি ১ হাজার ৪১৫ ডলার থেকে কমে ১ হাজার ৩৮৬ ডলারে নেমেছে। এছাড়াও কমে আসছে বেসরকারি বিনিয়োগের নিবন্ধন। বছরে ২০ লাখ লোক শ্রমবাজারে আসছে। কিন্তু কর্মসংস্থান নেই। একের পর এক বন্ধ হচ্ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এতে কর্মসংস্থানের বাজার আরও সংকুচিত হচ্ছে। বাড়ছে দারিদ্র্য। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দরিদ্র। শতকরা হিসাবে যা মোট জনসংখ্যার ২১ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৫ সালে নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছেন। এছাড়া চলতি বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। কিন্তু সর্বশেষ অর্জন ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

এদিকে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেই রাজনীতিতে উত্তাপ বাড়ছে। গণভোটের রায় অনুসারে সংস্কার বাস্তবায়ন এবং বাতিল হওয়া অধ্যাদেশগুলো আইনে রূপ দেওয়ার দাবিতে জোটবদ্ধভাবে রাজপথে আন্দোলনে নেমেছে সংসদের বিরোধী দল। এই জোটে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতৃত্বাধীন ১১টি দল রয়েছে। প্রথম দফায় ইতোমধ্যে ৭ দিনের কর্মসূচি শেষে নতুনভাবে ১৫ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে-রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে গণমিছিল, লিফলেট বিতরণ, সেমিনার। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ধাপে ধাপে আন্দোলন জোরদারের হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা। জোটের নেতারা বলছেন, জনগণের রায় এবং নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুসারে সরকার সংস্কার বাস্তবায়ন করছে না। এর মাধ্যমে তারা জনগণের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত করছে। এছাড়াও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি রাজনীতির জন্য ইতিবাচক নয়। সবকিছু মিলে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে সরকার।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।
Design & Development BY : ThemeNeed.com